কুষ্টিয়ায় পৌর কমিশনারের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা নাগরিক সনদ জালিয়াতি সিন্ডিকেট


মো: লিটন উজ্জামান :-
কুষ্টিয়ায় নাগরিক সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি লিখে নেওয়া, ব্যাংক থেকে ভূয়া ঠিকানায় ঋণ নেওয়াসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটে চলেছে। এর মাঝে গত ২২ নভেম্বর বুধবার ঠিকানা পরিবর্তন করে পাসপোর্ট করতে দিয়ে ফারাজ আলী (১৮) নামের এক রোহিঙ্গা তরুণ আটক হয়েছেন। ঐ দিন দুপুরে কুষ্টিয়
আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে এ ঘটনা ঘটে। ফারাজের দাবি, তিনি ভাসানচর ক্যাম্পে ছিলেন, তার বাবার নাম হামিদুল
জানা গেছে, ফারাজ নিজের নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করে নিজেকে সবুজ, বাবার নাম খেদের আলী, মায়ের নাম মরিয়ম বেগম, ঢাকা ঝানুপাড়া, জগতি, কুষ্টিয়া সদর পরিচয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে পাসপোর্টের আবেদন করেন। সাথে কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু জাহিদ সঞ্জুর সুপারিশ করা নাগরিক সনদ জমা দেন।
কুষ্টিয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন জানান, বুধবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে সবুজ আবেদনপত্র জমা দেন। আবেদনপত্রের সাথে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র ও নাগরিক দাখিল করেন। আবেদনের পর ফিঙ্গার প্রিন্ট এন্ট্রি করার জন্য গেলে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা
হাসান আলীর আবেদনকারীকে সন্দেহ হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি তার নিজের আসল পরিচয় স্বীকার করেন। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
অভিযুক্ত ফারাজ আলী জানান, তার সাথে কিছুদিন আগে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কুরিয়ার এক যুবকের পরিচয় হয়। ঘনিষ্ঠতার পরে তার থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট করে দেয়ার জন্য ৬০ হাজার টাকা নেয় ওই যুবক। টাকা নেয়ার পর ওই যুবকই তার সমস্ত কাগজ-পত্র তৈরি করে দেয়।
কুষ্টিয়া জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবু আনসার জানান,্চ.
আমরা কাগজের যাচাই-বাচাই করে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য রেজিস্ট্রেশন করি। কিন্তু এই কাগজ বা ডকুমেন্ট কারা কিভাবে দিচ্ছে সেটা আমাদের যাচাই করার সুযোগ নেই। তাই যারা তাকে জন্ম সনদ, নাগরিক সনদসহ জাতীয় পরিচয়পত্র করতে যেসব ডকুমেন্ট লাগে তা সরবরাহ করেছে, তারাই এর সাথে জড়িত। পর্যাপ্ত কাগজ না দিলে কারো জাতীয় পরিচয়পত্রহওয়া সম্ভব নয়।
কুষ্টিয়া জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আৰু আনসারের দেওয়া বক্তব্যে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, কুষ্টিয়াতে ঘটে যাওয়া নাগরিক সনদ জালিয়াতির ঘটনা মূল হোতা যেসব কমিশনার জন্ম সনদ ও নাগরিক সনদ প্রদান করেন। এর আগে ভূয়া ভোটার আইডি তৈরি করে একটি ভূমিদস্যু চক্র বিভিন্ন ব্যক্তির জমি নিজেরা লিখে নেয়। গত বছর ডিসেম্বর মাসে কুষ্টিয়ার সদর উপজেলায় ভুয়া দলিলের মাধ্যমে নামজারি তৈরি করে ২ বোনের প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের ২৮ বিথা পৈতৃক জমি ও পেট্রল পাম্পের জমি আত্মসাতের চেষ্টা করে। এ নিয়ে ভুক্তভোগী দুই বোন আদালতের দারস্থ হন। সে ঘটনায় জেলার প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, কমিশনারসহ বেশ কয়েকজনকে পিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ বিষয়ে আদালতে ৭টি মামলা চলমান রয়েছে। কমিশনার ও তার বাহিনী এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করেন না।
জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে রোহিঙ্গা যুবক ফারাজ আলী কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের একজন এজেন্টকে নগদ ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এ ঘটনায় সহজে বোঝা যাচ্ছে, প্রতারকচক্র থেমে নেই।
পৌর কমিশনারের নেতৃত্বে তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা রোহিঙ্গা, দাগি আসামি এবং বড় মাপের জালিয়াতির জন্য মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নাগরিক সনদ প্রদান করে আসছেন।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৬ নম্বর ওয়াডটি অধিক অপরাধ প্রবণ। এখানে মাদকসহ নানা অপকর্ম চলে। এলাকার অনেকের ধারণা, এখানে রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক আসে, সে কারণে এখানকার অনেকের সঙ্গেই রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ রয়েছে। গত দুদিনে শোনা যাচ্ছে, এর আগেও এ ওয়ার্ড থেকে অনেক রোহিঙ্গা যুবক মোটা টাকার বিনিময়ে নাগরিক সনদ নিয়েছেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু জাহিদ সঞ্জু জানান,
অনেক নাগরিক সনদে সুপারিশ করা লাগে। তাই কোন কাগজ বা কার পরিচয়ে তাকে সুপারিশ করা হয়েছে তা এখন বলা সম্ভব হচ্ছে না।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা জানান,কুষ্টিয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস কর্তৃপক্ষ এক রোহিঙ্গাকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর সাথে আর কারা জড়িত তাদের তথ্য সংগ্রহসহ সবার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করে আদালতে পাঠানো হবে।




Daily Aporadh Prokash