অপহরণের পর স্বজনদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রাণে ফিরতে পারলেন না টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদীরটা গ্রামের মেধাবী তরুণ রাকিব। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় ধার-দেনা করে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করেছিলেন কৃষক বাবা হাতেম আলী। কিন্তু সেই আশাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে বুকফাটা কান্নায়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার ফার্মগেট এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন রাকিব। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি।
পরিবারের দাবি, অপহরণকারীদের হাতে ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় ধার-দেনা করে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়া হয়। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও রাকিবকে জীবিত ফেরত দেওয়া হয়নি। পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মামুনের বাড়িতে রাকিবের সন্ধান মেলে। পরিবারের দাবি, ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ অপহরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মামুনকে আটক করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিমলায় তার বাড়ির আঙিনায় অভিযান চালানো হয়।
সেখানে একটি প্যাকেটজাত কার্টনের ভেতর থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। রাকিব ছিলেন পরিবারের স্বপ্নের সন্তান। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ হন তিনি।
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে একদিন ভালো চাকরি করবেন, প্রতিষ্ঠিত হবেন এবং পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন থেমে গেছে নিথর মরদেহের সামনে।
রাকিবের বাবা হাতেম আলী কৃষিকাজ করে সংসার চালান। তার দুই সন্তান—বড় ছেলে জীবন হোসেন ও ছোট ছেলে রাকিব। মা জহুরা বেগম। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন হাতেম আলী। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় মুক্তিপণের পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করলেও শেষ পর্যন্ত সন্তানকে হারাতে হয়েছে তাকে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাকিবের বাবা হাতেম আলী বলেন, যারা তার ছেলেকে অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
তিনি এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান। এদিকে রাকিবের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং পরে এক মেধাবী তরুণের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রাকিবের পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের প্রশ্ন—ধার-দেনা করে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পরও কেন রক্ষা হলো না রাকিবের জীবন?
একজন কৃষকের বুকের ধন, একজন মায়ের আদরের সন্তান এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারিয়ে গেছে নির্মম এই ঘটনায়। এখন রাকিবের পরিবারের একমাত্র দাবি—ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।