অপরাধআইন – আদালত

শ্রীপুরে সরকারি বনে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে পুরাতন ব্যাটারি আগুনে জ্বালিয়ে সিসা তৈরির কারখানা।

স্টাফ রিপোর্টারঃ

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের উত্তর পেলাইত এলাকার পারটেক্স বাউন্ডারির পূর্বপাশে গজারি বন ও আকাশমনি বাগানের বনের ভেতরে অবৈধ কারখানায় পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে সিসা।

তেলিহাটি ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য শিল্পী আক্তারের ছেলে শরিফ অবৈধভাবে বনভূমির ভেতরে ব্যাটারি কারখানাটি স্থাপন করেছে।

বন বিভাগের সিএস ১১২ নং দাগে সামাজিক বনায়নের আওতায় সৃজিত আকাশমনি বাগানের ভেতরেই সিসা তৈরির কাজ করছে শ্রমিকরা। প্রথমে পুরান ব্যাটারির ভেতর থাকা প্লেটগুলো বের করা হয়। পরে তা মাটিতে গর্ত করে কনক্রিটের ডালাই দেয়া চুল্লিতে সাড়ি সাড়ি করে বসানো হয় এবং কাঠ ও কয়লা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে বের করা হয় সিসা। পরে ছোট ছোট লোহার কড়াইয়ের সাহায্যে পাটালি আকারে জমাট করা হয়। পরে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

গহীন গজারি বন ও আকাশমনি বনভূমির বুক চিড়ে তৈরি রাস্তা দিয়ে পরিবহন করা হয় কারখানার মালামাল।
কাঠ, কয়লা ও বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে তৈরিকৃত সিসা পরিবহনের জন্যই এ রাস্তাটি করা হয়েছে।

স্থানীদের কয়েকজন বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত পুরাতন ব্যাটারির এসিডের গন্ধ ও কারখানা থেকে নির্গত ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বাতাসের সাথে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক,। উপজেলা পর্যায়ের একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, পুরাতন ব্যাটারির এসিড ও নির্গত রাসায়নিক জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরিকালে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া আশপাশে থাকা মানুষের শরীরে পয়জনিং সৃষ্টি করে। ফলে মানসিক বিকৃতি, রক্তশূন্যতা ও মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বন্যপ্রাণি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

গতো (৫’ই সেপ্টেম্বর ২০২৩) মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার ভেতরে শ্রমিকরা কাজ করছেন। কেউ পুরানো ব্যাটারির ওপরের অংশ খুলে ব্যাটারির ভেতর থাকা পাত বের করছেন। কয়েকজন ওপরের অংশ একটি ট্রাকে তুলছেন। কয়েকজন কারখানার এক অংশে ব্যাটারি পুড়িয়ে তৈরিকৃত সিসার পাঠালি সাড়ি করে রাখার কাজ করছেন। আবার কেউ ব্যাটারি থেকে এসিড বের করে সংরক্ষণের কাজ করছেন। এ কারখানায় কাজ করছেন ১২ জন শ্রমিক।

কারখানায় কাজ করা শ্রমিকেরা জানান, মাটিতে গর্ত করে কংক্রিটের তৈরি চুল্লিতে কাঠ ও কয়লায় এসিড মিশ্রিত ব্যাটারির বর্জ্য বা পাতের প্লেট সাজিয়ে বসানো হয়। রাত ১০:টার পর আগুন দিয়ে পুরানো হয়। এভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় সিসা। পুরোনো ব্যাটারির প্লেট খুলে টনপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি পান শ্রমিকেরা। এই কাজ করতে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে শ্রমিকদের দাবি।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, কারখানায় দিনে এসিড ও রাতে এসিড যুক্ত ব্যাটারি পোড়া কালো ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে ঝাঁঝালো গন্ধ এলাকাবাসীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।

দুর্গন্ধের কারণে কারখানা থেকে ৩শ’ মিটার দূরত্বের সড়কে চলাচল করতে পথচারীদের দম বন্ধ হয়ে আসে। আজিজ, হারুন ও হেলাল সহ বেশ কয়েকজন পথচারী জানিয়েছেন। এমন ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ কোথা থেকে আসে জানতাম না। তবে এখন জানতে পারলাম, এখানে এসিড যুক্ত ব্যাটারি পুড়ানোর কারণে এমন দুর্গন্ধ আসছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো হনে হচ্ছে।

কারখানার পরিচালক শরিফ জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে পুরানো ব্যাটারি সংগ্রহ করে ব্যাটারির প্লেট পুড়িয়ে সিসা তৈরি ও এসিড সংরক্ষণের কাজ করা হয় এ কারখানায়। দুই মাস আগে তিনি এই ব্যবসা শুরু করেছেন। তবে এখনো তিনি লোকসানে আছেন বলে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে সাতখামাইর বিট কর্মকর্তা ফরেস্টার আইয়ুব আলী খান বলেন, ১৫ দিন আগে খবর পেয়ে অবৈধ কারখানাটি ভেঙ্গে কিছু মালামাল অফিসে নিয়ে আসা হয়েছিল। মাঝখানে বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিলো শুনলাম আবার নাকি শুরু করেছে। দু- একদিনের মধ্যে আবার গিয়ে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আল মামুনের সাথে সাক্ষাতে তিনি বলেন, দু’ দিনের মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কারখানাটি ভেঙ্গে দেওয়া হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button