অপরাধআইন – আদালত

আশুলিয়ায় আলোচিত শিশু তাসিন হত্যার রহস্য উদঘাটন, মূল আসামি গ্রেপ্তার

রাহেল মাহমুদ :

ঢাকার আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকায় পাঁচ বছরের শিশু আব্দুর রহমান তাসিনকে বস্তাবন্দি করে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় এক সপ্তাহের তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. সাইফুল ইসলাম (২৭) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, শিশুটির বাবা মো. শহিদ মিয়ার ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই সাইফুল পাঁচ বছরের শিশু তাসিনকে হত্যা করেন। প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করলেও দ্বিতীয় দফা রিমান্ডের একপর্যায়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে আশুলিয়া থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক-উত্তর) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাসিনের বাবা মো. শহিদ মিয়ার সঙ্গে সাইফুল ইসলামের ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল। সেই আক্রোশ থেকেই প্রতিশোধ নিতে সাইফুল শিশুটিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তবে শহিদ মিয়ার সঙ্গে সাইফুলের কী নিয়ে বিরোধ বা আক্রোশ তৈরি হয়েছিল, তার বিস্তারিত কারণ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়নি। পুলিশ বলছে, তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, আলামত ও আসামির জবানবন্দি পর্যালোচনা করে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয়টি সামনে এসেছে।

গ্রেপ্তার মো. সাইফুল ইসলাম (২৭) নোয়াখালী জেলার সেনবাগ থানার ছাতাই পাইয়া এলাকার মৃত ছেরাজল হকের ছেলে। তিনি আশুলিয়ার ভাদাইল পশ্চিমপাড়া এলাকার হারুন অর রশিদের বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে সাইফুলকে দুই দফায় এক দিন করে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথম দফায় তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন। পরে তদন্তকারীরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সামনে রেখে তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে একপর্যায়ে সাইফুল হত্যার কথা স্বীকার করেন। রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এর আগে, গত ১৯ আগস্ট বিকেলে আশুলিয়ার ভাদাইল বাজার চৌরাস্তা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে খেলতে বের হয় শিশু আব্দুর রহমান তাসিন। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। সন্ধ্যার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশ ভাদাইল পশ্চিমপাড়ার হারুন অর রশিদের তৃতীয় তলা ভবনের ছাদে যায়। সেখানে একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির মুখ ও গলায় লাল টেপ প্যাঁচানো ছিল। মুখের ভেতরে চাল ও পলিথিন ঢোকানো অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

পাঁচ বছরের একটি শিশুকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর কীভাবে ভবনের ছাদে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো-এ নিয়ে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা মো. শহিদ মিয়া বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রাসেল আহমেদের ওপর।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, পারিপার্শ্বিক তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে একই ভবনের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলামের ওপর সন্দেহ ঘনীভূত হয়। পরে তার বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। সাইফুলের দেখানো ও শনাক্ত মতে তার বাসা থেকে একটি লাল রঙের শপিং ব্যাগ, দুই টুকরা ইলাস্টিক এবং ঘরের মেঝে ও খাটের নিচে ছড়িয়ে থাকা চাল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া তার বাসার বারান্দার নিচ থেকে স্কচটেপের একটি রোল উদ্ধার করা হয়। এসব আলামত উদ্ধারের পর তদন্তে সাইফুলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিষ্পাপ শিশুকে এমন নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত হত্যাকারীকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য, উদ্ধার হওয়া আলামত এবং আসামির জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে সাইফুল ছাড়া অন্য কারও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের দাবি, সাইফুল একাই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন এবং এর পেছনে শিশুটির বাবার ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ কাজ করেছে।

তবে শিশুটিকে কীভাবে ভবনের ছাদে নেওয়া হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ঘটনাক্রম কী ছিল, তদন্তের স্বার্থে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ।

এদিকে তাসিন হত্যার ঘটনায় স্বজনদের শোক এখনও কাটেনি। পাঁচ বছরের শিশুর এমন নির্মম মৃত্যুতে পুরো ভাদাইল এলাকাতেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মূল আসামি গ্রেপ্তার এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পর এখন স্বজন ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্ত শেষ করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে এ সময় ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান, আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম পিপিএম, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল আহমেদসহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button