অবৈধ সিএনজি সিন্ডিকেটের কার্গো বিস্ফোরণে আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপে নিহত ৭, আহত ৩০


নিজস্ব প্রতিবেদক, মেহেদী হাসানঃ
আশুলিয়ার জিরোবো বটতলা এলাকার ‘আজাদ সিএনজি পেট্রো এন্ড কেমিক্যাল কোং’-এর অবৈধ কার্গো সিলিন্ডার সিন্ডিকেটের ভয়াবহ পরিণতি দেখলো আশুলিয়াবাসী। নিয়মবহির্ভূতভাবে গ্যাস রিফিল করা একটি লড়ি ভর্তি কার্গো সিলিন্ডার বিস্ফোরণে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে জামগড়া এলাকার প্রীতি গ্রুপের একটি পোশাক কারখানার পার্কিং জোন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত ৭ জন নিহত এবং ৩০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা আনুমানিক ৬:৪০ মিনিটে জামগড়া এলাকায় অবস্থিত প্রীতি গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানার বাউন্ডারির ভেতরে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। জানা যায়, পোশাক কারখানার সীমানার ভেতরে রাখা প্রায় ১৯টি বড় কার্গো লড়ি ভর্তি গ্যাস সিলিন্ডার মজুত ছিল। হঠাৎ সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে বিকট শব্দে একটি লড়িতে থাকা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন পুরো প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে। বিকট শব্দ ও আগুনের তীব্রতায় কারখানার ভেতরে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা প্রাণভয়ে দিকবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, একটি সিলিন্ডার উড়ে গিয়ে কাছের একটি কাপড়ের দোকানে থাকা এক মহিলার মাথায় পড়লে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। এমনকি সিলিন্ডারের কিছু অংশ প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে জামগড়া মধ্যপাড়ার একটি বাড়ির টিনের চাল ও দেয়াল ভেঙে ভেতরে গিয়ে পড়ে।
ঘটনার পর পরই ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হলে ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিস থেকে ২টি এবং জিরাবো ফায়ার সার্ভিস থেকে ২টি—মোট ৪টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় কয়েক ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই ৭ জন প্রাণ হারান। আহত অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপক হারুন অর রশীদ ঘটনা ও আহতদের ভর্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, “আমাদের হাসপাতালে ৩০ জন আহত অবস্থায় এসেছেন। তাদের মধ্যে ৪ থেকে ৫ জনের শরীরের সিংহভাগ দগ্ধ হওয়ায় তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের এখানেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।” তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ও আহতদের সকলের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আশুলিয়ার জিরোবো (বটতলা) এলাকার ‘আজাদ সিএনজি পেট্রো এন্ড কেমিক্যাল কোং’-এর ভয়াবহ অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে, প্রশাসনিক নজরদারি কম থাকার সুবাদে রাত ৩টার দিকে এই পাম্পটি প্রতিটি কার্গো ভ্যানে গড়ে ১৩০টিরও বেশি বিপুল পরিমাণ গ্যাস সিলিন্ডারে বেআইনিভাবে ৭,৮০০ লিটার পর্যন্ত গ্যাস রিফিল করে দিত। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এসব তথাকথিত কার্গো ভ্যান ও সিলিন্ডার লড়িই মূলত একেকটি চলন্ত বোমা হিসেবে বিভিন্ন কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছিল। জ্বালানি গ্যাসের এই অবৈধ পাচার ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ কারগো ভ্যানে গ্যাস রিফিলের বিষয়ে তৎকালীন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি-এর জোনাল বিক্রয় অফিস (আশুলিয়া)-র ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবু সালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি চরম উদাসীনতা দেখিয়ে জানিয়েছিলেন—এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই, যা করার ফায়ার সার্ভিস বা স্থানীয় প্রশাসন করবে।
তিতাস কর্তৃপক্ষের সেই দিনের দায়সারা বক্তব্য ও চোখ বন্ধ করে রাখার চরম মাশুল গুনতে হলো আজ ৭টি তাজা প্রাণ হারিয়ে এবং ৩০ জন আশঙ্কাজনক রোগীকে হাসপাতালে পাঠিয়ে। আজকের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড প্রমাণ করলো যে তিতাসের উদাসীনতা এবং অসাধু সিএনজি পাম্প মালিকদের সিন্ডিকেট কেবল সরকারের কোটি টাকার গ্যাসই পাচার করছে না, বরং মানুষের জীবন নিয়েও ছিনিমিনি খেলছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে ‘আজাদ সিএনজি পেট্রো এন্ড কেমিক্যাল কোং’-সহ এই অনিয়মের সাথে জড়িত সিএনজি সিন্ডিকেট ও দায় এড়ানো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং প্রীতি গ্রুপের কারখানায় বেআইনি সিলিন্ডার মজুতের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছেন।




Daily Aporadh Prokash